ডিসেম্বরে শুরু হচ্ছে একাদশ বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের প্রথম পর্ব। জিততে হলে জানতে হবে, করতে হবে প্রচুর অনুশীলন। প্রস্তুতি পর্বেতোমাদের সঙ্গে আছেগণিত অলিম্পিয়াডের একাডেমিক সমন্বয়কারী অভীক রায়

প্রাইমারি
সবচেয়ে ছোট প্রতিযোগীদের বিভাগ নিয়েই সবচেয়ে বেশি কষ্ট করতে হয় গণিত অলিম্পিয়াডের একাডেমিক দলকে। এর সবচেয়ে বড় কারণটা হলো, অন্য সব ক্যাটাগরির তুলনায় এরা অনেক বেশি সৃজনশীল। সুতরাং এদের সৃজনশীলতার যোগ্য মূল্যায়ন করার ‘কঠিন’ কাজটা করতে গিয়ে প্রশ্ন করার লোকগুলোকে বরাবরই বেজায় খাটতে হয়।


কী কী পড়তে হবে?
প্রাইমারি ক্যাটাগরির প্রশ্নে খুব বেশি প্রাধান্য থাকে সংখ্যাতত্ত্বের একদম প্রাথমিক কিছু বিষয়ের। মৌলিক সংখ্যা, মৌলিক উৎপাদকে বিশ্লেষণ, গসাগু ও লসাগু, বিভাজ্যতা, জোড় ও বিজোড় সংখ্যার বিভিন্ন ধর্ম—এ রকম ছোট ছোট ও সহজ সহজ বিষয়গুলো আয়ত্ত করা চাই। এগুলোর বাইরে স্থানীয় মান, গড়, শতকরা হিসাব, ভগ্নাংশ, দশমিক—এগুলোর ওপর দখল থাকাটাও জরুরি। জ্যামিতির দিক থেকে দেখতে হবে ক্ষেত্রফল, পরিসীমা, কোণের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য। প্রশ্নগুলোতে শিক্ষার্থীদের চিন্তা করার শক্তি ব্যবহার করার জায়গা থাকবে। তেমনি দেখাতে হবে প্যাটার্ন বুঝতে পারার ক্ষমতাটা তোমাদের কেমন আছে।


কোথা থেকে পড়ব?
অলিম্পিয়াডের প্রতিযোগীদের প্রথম যেটা পড়তে হবে, সেটা হলো নিজ ক্যাটাগরির পাঠ্যবই। সেখানে যে বিষয়গুলো থাকে, সেগুলো ভালোমতো বুঝে পড়তে হবে। শুধু অনুশীলনীর অঙ্ক করে যাওয়া নয়, ভালোমতো পড়তে হবে সেই অনুশীলনীর আগে যে কথাগুলো লেখা থাকে সেগুলোও। গণিতের বিভিন্ন মজার বিষয় নিয়ে ধারণা পেতে পড়তে পারো মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও মোহাম্মদ কায়কোবাদ স্যারের লেখা নিউরনে অনুরণন এবং নিউরনে আবারো অনুরণন বই দুটি। এই বইগুলোতে বেশ কিছু মজার মজার সমস্যাও রয়েছে, সেগুলো সমাধান করার চেষ্টা করতে পারো। গণিত অলিম্পিয়াডের কিছু প্রশ্ন পাওয়া যাবে মুনির হাসানের

লেখা আমাদের গণিত উৎসব বইটিতে।

জুনিয়র
জুনিয়র ক্যাটাগরির শিক্ষার্থীরা গণিত অলিম্পিয়াডে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এর একটা দিক হলো, এদের ফলাফল থেকেই বিচার করা যায় আসলে শিক্ষার্থীদের বড় হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তাদের গণিত শেখা এবং গণিতকে ভালোবাসার প্রক্রিয়াটাও সঠিক পথে এগোচ্ছে কি না। সেই সঙ্গে এই ক্যাটাগরির শিক্ষার্থীদেরই একটা অংশ অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের মঞ্চে, তার প্রস্তুতিটাও হওয়া চাই ঠিকঠাক।


কী কী পড়তে হবে?
আমাদের দেশের পাঠ্যক্রমে বীজগণিতের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় ষষ্ঠ শ্রেণীতে। অলিম্পিয়াডেও বীজগণিতের ধারণাগুলো ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর করতে হবে। সেখানে থাকবে সূচকের ব্যবহার, সমীকরণ সমাধান ও অসমতার ব্যবহার। সংখ্যাতত্ত্বের প্রাথমিক বিষয়গুলো আয়ত্তে থাকতে হবে। পাশাপাশি ডায়োফ্যান্টাইন সমীকরণ, মডিউলার অ্যারিথমেটিক সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক ধারণা থাকাটা সহায়ক হবে। গণনাসংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য কিছুটা কমনসেন্স থাকাটাই যথেষ্ট, সঙ্গে যোগ আর গুণের ব্যাপারগুলো বুঝলেই হয়। জ্যামিতিতে সমান্তরাল রেখা, সদৃশকোণী ত্রিভুজ, ত্রিভুজসংক্রান্ত উপপাদ্যের ব্যবহার জানা চাই। একটুখানি ত্রিকোণমিতি জানাটা সুবিধাজনক হতে পারে কখনো কখনো।


কোথা থেকে পড়ব?
যে বিষয়গুলোর কথা বলা হলো, তার প্রায় সবই ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণীর পাঠ্যবইগুলোতে আলোচনা করা হয়েছে। সুতরাং খুব ভালো করে বুঝে বুঝে পড়তে হবে নিজের বই। বই থেকে শুধু জ্যামিতির উপপাদ্যের প্রমাণ জানলেই হবে না, ‘এক্সট্রা’গুলোও সমাধান করার চেষ্টা করতে হবে। পাঠ্যপুস্তকের বাইরে গৌরাঙ্গ দেব রায় স্যারের একটুখানি গণিত, মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও জাকারিয়া স্বপনের গণিত এবং আরো গণিত বইগুলো প্রস্তুতি নেওয়ার ব্যাপারে সহায়ক হবে। সংখ্যাতত্ত্বের জন্য জোন্স-এর Elementary Number Theory, টেলাংয়ের Number Theory এবং অ্যাডলারের Theory of Numbers এর যেকোনো একটি অনুসরণ করা যেতে পারে। সমস্যা সমাধানের জন্য 104 Number Theory Problems বইটা সহায়ক হবে। জ্যামিতির প্রস্তুতি নিয়ে একটু আলাদা করে বলার আছে। আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশ দলের প্রথম লক্ষ্যই থাকে জ্যামিতির সমস্যাগুলো সমাধান করা। এর কারণ দশম শ্রেণী পর্যন্ত জ্যামিতির যে সিলেবাস নির্ধারণ করা রয়েছে, সেটা বেশ উন্নত এবং সেগুলোর ওপর ভালো দখল থাকলে অনেক সমস্যার সমাধান সহজেই করা যায়। সুতরাং অলিম্পিয়াডের জন্য জুনিয়র ক্যাটাগরির যারা কোমর বেঁধে নামছ, তাদের জন্য সবচেয়ে ভালো হবে নবম-দশম শ্রেণী পর্যন্ত জ্যামিতির সিলেবাসটুকু নিজে নিজে পড়ে ফেলা, সেখানকার এক্সট্রাগুলোসহ। জ্যামিতির প্রস্তুতির জন্য এর বাইরে Geometry Revisited (বাংলায়—জ্যামিতির দ্বিতীয় পাঠ) এবং Plane Euclidean Geometry বইগুলো দেখা যেতে পারে।

সেকেন্ডারি ও হায়ার সেকেন্ডারি
প্রশ্ন ভিন্ন হলেও এই দুই ক্যাটাগরির শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি প্রায় একই রকম হয়। এর কারণ অলিম্পিয়াডের প্রস্তুতি নিতে যে বিষয়গুলো খুব ভালো করে পড়তে হয়, তার অধিকাংশ জিনিস আসলে নবম-দশম শ্রেণীর মাঝেই পড়া হয়ে যায়। এই দুই ক্যাটাগরির শিক্ষার্থীরাই সাধারণত আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে। সুতরাং এদের যাচাই করে নিতে প্রশ্নের ধরন ও কাঠামোতে সবচেয়ে বেশি বৈচিত্র্য থাকে, অন্য ক্যাটাগরির তুলনায় প্রশ্ন বেশ কিছুটা কঠিনও হয়। তবে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই, শুধু নিয়মিত পড়াশোনা এবং সমস্যা সমাধানের চর্চাটা ধরে রাখতে হবে।


কী কী পড়তে হবে?
সেট এবং ফাংশনের ধারণাটা নবম শ্রেণীতেই প্রথম দেওয়া হয়। এই ধারণাগুলো ব্যবহার করে অলিম্পিয়াডের বেশ কিছু প্রশ্ন সমাধান করা যাবে। বীজগণিতের অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে ধারা, অসমতা, সূচক ও লগারিদম সম্পর্কে জানতে হবে। বিশেষ জোর দিতে হবে জ্যামিতির ওপর। নবম-দশম শ্রেণীর সাধারণ ও উচ্চতর গণিতের বইয়ে থাকা জ্যামিতির বিষয়গুলো খুব ভালোভাবে রপ্ত করতে হবে। ভালো দখল থাকা চাই ত্রিকোণমিতির ওপরেও। এর পরেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো সংখ্যাতত্ত্ব। মৌলিক সংখ্যা, বিভাজ্যতা, গসাগু-লসাগুর মতো প্রাথমিক বিষয়গুলো থেকেও কঠিন কঠিন সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে। কাজে লাগবে ডায়োফ্যান্টাইন সমীকরণ এবং মডিউলার অ্যারিথমেটিকের ধারণাগুলো। বইয়ের বাইরে থেকে তাই ফার্মার ‘ছোট্ট’ উপপাদ্য (Fermat’s Little Theorem), অয়লারের উপপাদ্য, উইলসনের উপপাদ্য—এগুলোও দেখে নেওয়া যেতে পারে।
গণনাসংক্রান্ত সমস্যাগুলো এই দুই ক্যাটাগরির প্রশ্নে থাকে। এ জন্য ‘বিন্যাস-সমাবেশ’-এর কিছু (হায়ার সেকেন্ডারি ক্যাটাগরির জন্য কিছুটা বেশি) ধারণা থাকা চাই। বাস্তব সংখ্যার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য, লেখচিত্র—এ বিষয়গুলোও চলে আসতে পারে। হায়ার সেকেন্ডারি ক্যাটাগরির জন্য সম্ভাব্যতা বিষয়ে ভালো ধারণা থাকাটা বেশ জরুরি।


কোথা থেকে পড়ব?
তোমাদের পাঠ্যপুস্তকের কথা বেশ কয়েকবার বলে ফেলেছি। প্রধান গুরুত্ব দিতে হবে সেটাকেই। The Art and Craft of Problem Solving বইটি পড়তে হবে সমস্যা সমাধান শেখা ও চর্চা করার জন্য। এটা যদি কারও পড়া হয়ে গিয়ে থাকে, তা হলে Problem Solving Strategies বইটি পড়া যেতে পারে। শুধু জুনিয়র ক্যাটাগরির জন্য নয়, Geometry Revisited এবং Plane Euclidean Geometry বই দুটি দরকার হয়ে পড়বে তোমাদের প্রস্তুতির জন্যও। সংখ্যাতত্ত্বের জন্য জুনিয়র ক্যাটাগরির শিক্ষার্থীদের যে বইগুলোর কথা বললাম, সেগুলো তোমাদেরও লাগবে। কম্বিনেটরিক্সের প্রস্তুতি ও সমস্যা সমাধানের জন্য A pathway to undergraduate combinatorics এবং 101 problems in algebra বইগুলো সহায়ক হবে।