সবুজ, নীল, কালো, লাল, হলুদ—পাঁচটি রং একটি সাদা রঙের পটভূমির ওপর ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের (আইএমও) লোগো তৈরি করা হয়েছে। পাঁচটি রঙের মাধ্যমে মূলত পাঁচটি মহাদেশ বোঝানো হয়। পাশাপাশি একটি বিশেষ দিক হলো, বিশ্বের প্রতিটি দেশের পতাকাতেই এই পাঁচ রঙের অন্তত একটি রং রয়েছে।

২০ সেপ্টেম্বর ভার্চ্যুয়াল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শুরু হয় আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড–২০২০। অন্যান্য বছর সারা বিশ্বের অংশগ্রহণকারীরা একই পরীক্ষাকেন্দ্রে উপস্থিত হয়। একই সময়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। কিন্তু এবার সবাই নিজ দেশ থেকে অংশগ্রহণ করেছে। পরীক্ষার সময়টি এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যেন সবাই একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরীক্ষা শুরু করে। আবার এমন যেন না হয় যে এক দেশের পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল, আর অন্য দেশে শুরুই হলো না।

বাংলাদেশে আয়োজন

এ বছর প্রতিটি অংশগ্রহণকারী দেশই আয়োজকের ভূমিকায় ছিল। আইএমওর আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা অনুসরণ করে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর স্থানীয় অলিম্পিয়াড কমিটি পরীক্ষাকেন্দ্রগুলো তৈরি করে। ছয়জন প্রতিযোগী সরাসরি পরীক্ষাকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে আইএমও পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে।

অলিম্পিয়াড এবার ভার্চ্যুয়াল হবে—এই ঘোষণার পরপরই মূল আয়োজক দেশ রাশিয়া থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পাঠানো শুরু হয়। প্রতিটি কেন্দ্রের জন্য একজন নিরপেক্ষ কমিশনার নির্ধারণ করা হয়, আর যেসব দেশে একাধিক কেন্দ্র ছিল, সেখানে একাধিক কমিশনার কাজ করেছেন। পাশাপাশি দলনেতা, উপদলনেতা, তিনজন পর্যবেক্ষক ও একজন আইটি বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেওয়া হয়। বাংলাদেশের জন্য পরীক্ষাকেন্দ্র হিসেবে নির্বাচিত হয় প্রথম আলো কার্যালয়ের প্রশিক্ষণকক্ষ। বাংলাদেশের পুরো আয়োজনটি হয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রথম আলোর সার্বিক ব্যবস্থাপনায়। আনুষঙ্গিক আয়োজন করেছে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি।

পরীক্ষাকেন্দ্রের প্রস্তুতি

পরীক্ষাকেন্দ্রের ছিল দুটি অংশ। একটি পরীক্ষাকক্ষ এবং অন্যটি নিয়ন্ত্রণকক্ষ। দুটি কক্ষই ভার্চ্যুয়াল সভা কক্ষের মাধ্যমে মূল আয়োজক কমিটির নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে যুক্ত ছিল। নির্দিষ্ট সময়ের আধঘণ্টা আগে কমিশনারের অনলাইন অ্যাকাউন্টে আসা প্রশ্ন নামিয়ে প্রিন্ট করতে হয়েছে। বাংলাদেশে পরীক্ষা শুরু হয় বেলা দুইটায়। দুই দিনের পরীক্ষা পর্বে প্রতিদিনই সময় ছিল ৪ ঘণ্টা ৩০ মিনিট। নির্দিষ্ট সময়ের ১৫ মিনিট আগে শিক্ষার্থীরা রুমে প্রবেশ করে। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর আলাদাভাবে স্ক্যান করে আইএমও মূল ওয়েব পোর্টালে যুক্ত করতে হয়েছে। উত্তরপত্রের পাতাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে গণনা করে তা মূল্যায়নের জন্য প্রস্তুত করা হয়।

নানা ধরনের নিয়ম

পরীক্ষাকেন্দ্র পরিচালনার জন্য নানা নিয়মনীতির উল্লেখ ছিল। যেমন পরীক্ষাকেন্দ্রে ঘড়ি থাকতে হবে, কিন্তু টিকটিক শব্দ হওয়া চলবে না। আবার খাবার ও পানীয়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে, তবে খাবার খেতে বা প্যাকেট খুলতে শব্দ হতে পারে, এমন কিছু দেওয়া যাবে না। মূলত অতিরিক্ত কোনো শব্দের কারণে যেন অংশগ্রহণকারীদের কারও মনোযোগ নষ্ট না হয়, তাই এমন ব্যবস্থা রাখতে হয়েছে। কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকলেও সেগুলো লিখে জমা দিয়ে জানাতে হয়েছে, জিজ্ঞাসার উত্তরও দিতে হয়েছে লিখিতভাবে।

পরীক্ষার শেষে ভার্চ্যুয়ালি নানা আয়োজন

আইএমও সাধারণত একটি সপ্তাহব্যাপী আয়োজন বলা যেতে পারে। ২০ সেপ্টেম্বর উদ্বোধনের পর ২১-২২ তারিখ ছিল পরীক্ষা পর্ব। ২৩-২৬ তারিখ পর্যন্ত রাখা হয়েছে নানা রকম ভার্চ্যুয়াল আয়োজন। আয়োজক শহর সেন্ট পিটার্সবার্গের উল্লেখযোগ্য ও দর্শনীয় স্থানগুলো নিয়ে বেশ কিছু তথ্যচিত্র প্রকাশ করা হয়েছে। ছিল ভার্চ্যুয়াল লাইভ ট্যুরের আয়োজন। পাশাপাশি বিশিষ্ট গণিতবিদদের সঙ্গে অনলাইন সাক্ষাৎকারে অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল। ছিল অনলাইন দাবা প্রতিযোগিতাও।

সারা পৃথিবী থেকেই শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করছে, আয়োজকেরাও চেষ্টা করেছেন সবাইকে নিয়েই নানা আয়োজন রাখতে। যেমন কোনো দেশে সকালের নাশতার ছবি পাঠাতে বলা হয়েছে ইনস্টাগ্রাম চ্যানেলে, যার নাম দেওয়া হয়েছে স্যান্ডুইচ চ্যালেঞ্জ। তবে ২৩-২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিটি দলের প্রধান ও ডেপুটি লিডার ব্যস্ত ছিলেন প্রতিযোগিতার খাতা মূল্যায়নের কাজে। ২৮ সেপ্টেম্বর ফলাফল ঘোষণা ও অন্যান্য আয়োজনের মাধ্যমে শেষ হবে ২০২০–এর আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড।

অনলাইন আয়োজনের বিভিন্ন পর্বগুলো সবার জন্যই উন্মুক্ত এবং নির্দিষ্ট সময়ের পর এই ছবি ও ভিডিওগুলো পাওয়া যাবে আইএমও–২০২০–এর ইনস্টাগ্রাম চ্যানেলে (instagram.com/v.imo2020) আর আয়োজনের সব তথ্য পাওয়া যাবে এই ঠিকানায়: imo 2020.ru

লেখক: আইটি ব্যবস্থাপক, আইএমও–২০২০, বাংলাদেশ পর্ব

 

কেমন হলো এবারের পরীক্ষা

মির্জা তানজীম শরীফ, পর্যবেক্ষক, বাংলাদেশ গণিত দল

কাঠিন্যের মাত্রা বিবেচনায় এ বছরের সমস্যাগুলো অন্য সব বছরের মতো হলেও গণনাতত্ত্বের (কম্বিনেটরিক্স) সমস্যার আধিক্য ছিল চোখে পড়ার মতো। ছয়টি সমস্যার তিনটিই সরাসরি গণনাতত্ত্ব থেকে এসেছে এবং অপর একটি সমস্যা সমাধানেও এর সহায়তা নিতে হয়। প্রথম দিনের দুই নম্বরে ছিল অসমতাসংক্রান্ত একটি বীজগাণিতিক সমস্যা, যেটি আইএমওর ইতিহাসে কিছুটা বিরল (অসমতার সর্বশেষ সমস্যাটি এসেছিল ২০১২ সালে, যে বছর বাংলাদেশ থেকে প্রতিযোগী হিসেবে আমি অংশ নিয়েছিলাম)। এত কিছুর পরও, এবার দেশের প্রতিযোগীদের দলগত নম্বর অতীতের সব রেকর্ড ভাঙবে বলে আমার বিশ্বাস।

পর্যবেক্ষক হিসেবে এ বছর আমার দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশ জাতীয় গণিত দলের কোচ ড. মাহবুব মজুমদারের প্রতিনিধিত্ব করা, প্রতিযোগীদের সমাধানগুলোর প্রাথমিক মূল্যায়ন করা, নির্ধারিত নম্বর বণ্টনের আলোকে আমাদের প্রাপ্ত নম্বরের ধারণা নেওয়া এবং কেন্দ্রীয় মূল্যায়ন পর্যবেক্ষণ করা। প্রাথমিক মূল্যায়ন শেষে দেখা গেছে, আমাদের ছয়জন প্রতিযোগীই ১ ও ৪ নম্বর সমস্যার পূর্ণ সমাধান করেছে। দ্বিতীয় ও পঞ্চম সমস্যার সমাধান করেছে দুজন এবং সমস্যাগুলোর আংশিক সমাধান এসেছে দলের বাকি সদস্যদের কাছ থেকে। আইএমওর সবচেয়ে কঠিন সমস্যা আসে ৩ ও ৬ নম্বরে। সে দুটিতেও আমরা আংশিক নম্বর পাব বলে আশা করছি।

 

এটি আমার প্রথম আইএমও হওয়ায় শুরুতে অনেক নার্ভাস লাগছিল। কিন্তু দলের অন্য সদস্যদের সহায়তায় দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছি। এবার আইএমও ভার্চ্যুয়াল হলেও পরীক্ষার সময়সহ অন্যান্য মুহূর্ত যথেষ্ট উপভোগ করেছি। আদনান সাদিক, কুষ্টিয়া জিলা স্কুল

এ বছর করোনার জন্য বিদেশে গিয়ে আইএমওতে অংশ নিতে না পারলেও দেশেই যখন আইএমওর দ্বিতীয় দিন শেষ হয়, খুব ভালো লাগছিল—দেশে বসেও অন্তত অংশ তো নিতে পারলাম। অন্যদিকে খারাপ লাগছিল এই ভেবে যে আমার জীবনের প্রথম ও শেষ আইএমও ছিল এটি। রাইয়্যান জামিল, নটর ডেম কলেজ, ঢাকা
একে তো অনলাইন আইএমও, বিদেশি বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের একেবারেই ভালো সুযোগ নেই, তার ওপর ‘বিখ্যাত’ রুশ ধাঁচের গাণিতিক সমস্যা, অদ্ভুত এক আইএমও হলো এ বছর। ভার্চ্যুয়াল এই আইএমও করোনার মধ্যে কিছুটা হলেও প্রিয় বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ করে দিয়েছে। এম আহসান-আল-মাহীর, এসওএস হারম্যান মেইনার কলেজ, ঢাকা

সত্যিকার আইএমওর বিকল্প না হতে পারলেও অনলাইন আইএমও এবার বিদেশের অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ আর আইএমওর ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি অংশগ্রহণের কিছুটা হলেও সুযোগ করে দিয়েছে। গাণিতিক সমস্যাগুলো একটু বৈচিত্র্যপূর্ণ ছিল, তবু যথেষ্ট উপভোগ করেছি। মো. মারুফ হাসান, আনন্দ মোহন কলেজ, ময়মনসিংহ

অংশগ্রহণকারী হিসেবে আমার শেষ আইএমও ছিল এবার। এক বছর আগেও চিন্তা করিনি, এটা এভাবে শেষ হবে। ভালো-খারাপ দুই ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছে এ বছরের আইএমওতে। কিন্তু এই করোনা মহামারিতে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে আয়োজনটি সম্পন্ন করার জন্য ধন্যবাদ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটিকে। সৌমিত্র দাস, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর

গত বছর আইএমও নিয়ে একটা আক্ষেপ ছিল, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অংক করতে পারিনি। এ বছর আমার বিশ্বাস, আমি আমার গাণিতিক দক্ষতা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পেরেছি। দেশের মাটিতে বসে পরীক্ষা দেওয়ার জন্য বিদেশে ঘোরার সুযোগ হাতছাড়া হলেও পরিচিত পরিবেশে পরীক্ষা হয়েছে বলে মানসিক চাপ কম ছিল। আহমেদ ইত্তিহাদ, ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ

প্রথম প্রকাশ: প্রথম আলো, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, https://www.prothomalo.com/feature/shapno/%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A7%87-%E0%A6%86%E0%A6%87%E0%A6%8F%E0%A6%AE%E0%A6%93%E0%A6%B0-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A5%E0%A6%AE-%E0%A6%85%E0%A6%AD%E0%A6%BF%E0%A6%9C%E0%A7%8D%E0%A6%9E%E0%A6%A4%E0%A6%BE